তারাবীহ ২০ রাকাতের দলিল

তারাবীহ ২০ রাকাতের দলিল ও সঠিক তথ্য | রমজান স্পেশাল

রমজান মাস মানেই মুমিনের হৃদয়ে এক অন্যরকম প্রশান্তি আর উৎসবের আমেজ। সারাদিন রোজা রাখার পর রাতের বেলা তারাবীহ নামাজ আদায় করা যেন আত্মার খোরাক জোগায়। কিন্তু প্রতি বছর রমজান এলেই আমাদের সমাজে, চায়ের কাপে কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা সাধারণ বিতর্ক মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে—তারাবীহ কি ৮ রাকাত নাকি ২০ রাকাত? আরে ভাই, ইবাদত নিয়ে তর্কে না জড়িয়ে আসুন ঠান্ডা মাথায় জেনে নিই তারাবীহ ২০ রাকাতের দলিল এবং এর পিছনের সুদীর্ঘ ইতিহাস।

রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং তাঁর সাহাবায়ে কেরামের আমল থেকে আমরা আসলে কী শিক্ষা পাই? ইসলামি শরিয়তে তারাবীহ ২০ রাকাতের দলিল কতটা শক্তিশালী বা গ্রহণযোগ্য? আজকের এই আর্টিকেলে আমরা একদম সহজ চলিত ভাষায়, নির্ভরযোগ্য দলিল-প্রমাণসহ এই বিষয়গুলো আলোচনা করব। ভেবে দেখুন তো, সাহাবায়ে কেরাম কি কোনো ভুল সিদ্ধান্তের ওপর একমত হতে পারেন? চলুন, মনের সব সংশয় দূর করে গভীরে প্রবেশ করা যাক।

আরও পড়ুন: তারাবির নামাজ পড়ার নিয়ম ও ফজিলত ২০২৬

তারাবীহ ২০ রাকাতের দলিল কী ও কেন গুরুত্বপূর্ণ

তারাবীহ শব্দটি ‘তারবিহাতুন’ এর বহুবচন, যার অর্থ হলো বিশ্রাম নেওয়া বা প্রশান্তি লাভ করা। দীর্ঘ নামাজের ফাঁকে ফাঁকে বিশ্রাম নেওয়া হয় বলে একে তারাবীহ বলা হয়। রমজান মাসে এশার নামাজের পর বিতরের আগে এই নামাজ আদায় করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। এটি নারী-পুরুষ সবার জন্যই অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ইবাদত। কিন্তু রাকাত সংখ্যা নিয়ে কেন এত আলোচনা?

আসলে, সঠিক দলিল জানা থাকলে ইবাদতে একাগ্রতা আসে এবং মনের খটকা দূর হয়। আমাদের সমাজে কেউ ৮ রাকাত পড়েন, আবার কেউ ২০ রাকাত। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম উম্মাহ এবং মক্কা-মদিনার আমল অনুযায়ী ২০ রাকাতের প্রচলনই বেশি। তাই তারাবীহ ২০ রাকাতের দলিল জানাটা আমাদের ঈমানি দায়িত্বের মধ্যে পড়ে, যাতে আমরা ফিতনা থেকে বেঁচে থাকতে পারি।

রাসূলুল্লাহ (সা.) এর যুগে তারাবীহ নামাজের অবস্থা

রাসূলুল্লাহ (সা.) এর যুগে তারাবীহ জামাতে পড়া হতো, তবে তিনি নিয়মিত জামাতে আসেননি। এর কারণ ছিল উম্মতের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা ও দয়া। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদিস থেকে জানা যায়, নবীজি (সা.) মাত্র তিন রাত সাহাবীদের নিয়ে জামাতে তারাবীহ আদায় করেছিলেন। এরপর তিনি আর আসেননি, এই ভয়ে যে—যদি তিনি নিয়মিত জামাতে পড়েন, তবে আল্লাহ তা’আলা হয়তো এটি উম্মতের ওপর ফরজ করে দেবেন, আর উম্মত তা পালন করতে কষ্ট পাবে।

সেই সময় রাসূলুল্লাহ (সা.) নির্দিষ্ট কোনো রাকাত সংখ্যা কঠোরভাবে নির্ধারণ করে দেননি বলে অনেক আলেম মত প্রকাশ করেন। তবে তিনি রাতের নামাজ বা কিয়ামুল লাইল এর প্রতি খুব গুরুত্ব দিয়েছেন। মূলত, নবীজির আমল ছিল দীর্ঘ তিলাওয়াত ও ধীরস্থির রুকু-সেজদার মাধ্যমে নামাজ আদায় করা।

তারাবীহ ২০ রাকাতের দলিল সাহাবায়ে কেরামের আমল থেকে

সাহাবায়ে কেরামের আমলই হলো আমাদের জন্য অন্যতম বড় দলিল। বিশেষ করে খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নত আঁকড়ে ধরা আমাদের জন্য ওয়াজিব। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিস মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবায় উল্লেখ আছে যে, ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) রমজান মাসে ২০ রাকাত তারাবীহ এবং বিতর পড়তেন।’ যদিও এই হাদিসের সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে কিঞ্চিৎ মতভেদ আছে, তবে সাহাবীদের ইজমা বা ঐকমত্য একে শক্তিশালী করেছে।

সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ হলো, রাসূলুল্লাহ (সা.) এর ওফাতের পর সাহাবায়ে কেরাম কীভাবে নামাজ পড়তেন। হযরত উমর, হযরত উসমান ও হযরত আলী (রা.) এর শাসনামলে মসজিদে নববীতে ২০ রাকাত তারাবীহ জামাতের সাথে আদায় করা হতো। এর বিপক্ষে কোনো সাহাবী কখনো কোনো আপত্তি তোলেননি। সাহাবীদের এই নীরব সম্মতি বা ইজমা প্রমাণ করে যে তারাবীহ ২০ রাকাতের দলিল অত্যন্ত মজবুত।

হযরত উমর (রা.) এর সিদ্ধান্ত ও ইজমা

হযরত উমর (রা.) এর খিলাফতকালে তিনি দেখলেন, মসজিদে নববীতে মানুষ বিচ্ছিন্নভাবে তারাবীহ পড়ছে। কেউ একা, কেউ ছোট ছোট দলে। এই দৃশ্য দেখে তিনি ভাবলেন, সবাইকে এক ইমামের পেছনে একত্র করলে বিষয়টি আরও সুন্দর হবে। তখন তিনি হযরত উবাই ইবনে কাব (রা.)-কে ইমাম নিযুক্ত করলেন এবং ২০ রাকাত তারাবীহ পড়ার নির্দেশ দিলেন।

ইমাম বায়হাকী (র.) সহীহ সনদে বর্ণনা করেন যে, ‘হযরত উমর (রা.) এর যুগে সাহাবায়ে কেরাম ২০ রাকাত তারাবীহ পড়তেন।’ মক্কা ও মদিনার হারাইন শরীফে সেই থেকে আজ পর্যন্ত এই আমল চলে আসছে। হযরত উমর (রা.) এর এই সিদ্ধান্তকে সকল সাহাবী বিনা বাক্যে মেনে নিয়েছিলেন। ইসলামি শরিয়তে সাহাবীদের ইজমা বা ঐকমত্য শরীয়তের অন্যতম দলিল হিসেবে গণ্য হয়।

চার মাজহাবের দৃষ্টিতে তারাবীহ ২০ রাকাতের দলিল

বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম চার মাজহাবের অনুসারী। আসুন দেখি, চার মাজহাবের ইমামগণ তারাবীহ সম্পর্কে কী বলেছেন। তাঁদের মতামতের একটি সংক্ষিপ্ত ছক নিচে দেওয়া হলো:

মাজহাব/ইমামরাকাত সংখ্যামতামত ও দলিল
ইমাম আবু হানিফা (র.)২০ রাকাতএটি সুন্নতে মুয়াক্কাদা এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নত।
ইমাম শাফেয়ী (র.)২০ রাকাতমক্কা ও মদিনার সাহাবীদের আমল এবং ইজমা ভিত্তিক।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (র.)২০ রাকাতহযরত উমর (রা.) এর আমলকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
ইমাম মালিক (র.)২০ বা ৩৬ রাকাতমদিনাবাসীর আমল ৩৬ রাকাত ছিল (দীর্ঘ বিরতিসহ), তবে ২০ রাকাতের কমে নয়।

দেখুন, চার মাজহাবের কোনো ইমামই ৮ রাকাতের পক্ষে ফতোয়া দেননি। তাঁরা সবাই সাহাবাদের আমলকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

৮ রাকাত বনাম ২০ রাকাত বিতর্কের সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে ৮ রাকাতের কথা কোত্থেকে এল? মূলত, সহীহ বুখারীতে হযরত আয়েশা (রা.) এর একটি হাদিস আছে যেখানে বলা হয়েছে, রাসূল (সা.) রমজানে বা রমজানের বাইরে ১১ রাকাতের বেশি পড়তেন না (৮ রাকাত তাহাজ্জুদ + ৩ রাকাত বিতর)। অনেক আলেম মনে করেন, এটি ছিল নবীজির তাহাজ্জুদ নামাজের বর্ণনা, তারাবীহ নয়।

কারণ তারাবীহ কেবল রমজানে পড়া হয়, আর ওই হাদিসে ‘রমজানের বাইরে’র কথাও বলা হয়েছে। তাই অধিকাংশ ফকিহ ও মুহাদ্দিসদের মতে, ওই হাদিসটি তাহাজ্জুদের সাথে সম্পর্কিত। তারাবীহ এবং তাহাজ্জুদ ভিন্ন ইবাদত—এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটি বুঝলে আর কোনো বিতর্ক থাকে না। ২০ রাকাতের বিষয়টি সাহাবাদের আমল দ্বারা সুনির্দিষ্ট।

তারাবির নামাজ পড়ার নিয়ম সংক্ষেপে

তারাবির নামাজ এশার নামাজের ৪ রাকাত ফরজ ও ২ রাকাত সুন্নতের পর আদায় করতে হয়। এটি দুই রাকাত করে করে পড়া উত্তম। প্রতি দুই রাকাত পর সালাম ফেরাতে হয় এবং প্রতি চার রাকাত পর একটু বিশ্রাম নেওয়া মুস্তাহাব। এই বিশ্রামের সময় তাসবিহ পাঠ, জিকির বা দোয়া করা যায়।

  • প্রথমে নিয়ত করবেন: ‘আমি কিবলামুখী হয়ে আল্লাহর ওয়াস্তে দুই রাকাত তারাবীহ নামাজের নিয়ত করলাম।’
  • সাধারণ নামাজের মতোই সানা, সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা মেলাবেন।
  • ২০ রাকাত শেষে বিতর নামাজ আদায় করবেন।

তারাবির নামাজ পড়ার নিয়ম মহিলাদের জন্য

আমাদের মা-বোনদের জন্য তারাবির নামাজ ঘরে আদায় করা সবচেয়ে উত্তম। মহিলাদের জন্য জামাতে যাওয়া জরুরি নয়, বরং ঘরের নির্জন কোণে নামাজ পড়া তাদের জন্য অধিক সওয়াবের। নিয়ম পুরুষদের মতোই, তবে তারা একাকী পড়বেন।

মহিলারা তাদের সাংসারিক কাজ শেষ করে ধীরস্থিরভাবে এশার নামাজের পর এই নামাজ আদায় করবেন। যদি ২০ রাকাত পড়তে কষ্ট হয়, তবে যতটুকু সম্ভব ততটুকু পড়বেন, কিন্তু সুন্নতের হক আদায় করতে ২০ রাকাত পড়াই শ্রেয়। মনে রাখবেন, ইবাদতে তাড়াহুড়ো করা ঠিক নয়।

মহিলাদের তারাবির নামাজ জামাতে পড়ার নিয়ম

যদিও ঘরে পড়া উত্তম, তবুও যদি কোনো মহিলা জামাতে পড়তে চান বা এমন কোনো ব্যবস্থা থাকে যেখানে পর্দার সাথে জামাত হয়, তবে তারা অংশগ্রহণ করতে পারেন। তবে শর্ত হলো—পর্দা সুনিশ্চিত হতে হবে এবং পুরুষদের সাথে মেলামেশার সুযোগ থাকা যাবে না।মহিলারা ইমামের পেছনে দাঁড়াবেন এবং ইমামের ইকতেদা করবেন। তবে বর্তমান ফিতনার যুগে ওলামায়ে কেরাম মহিলাদের মসজিদে আসার চেয়ে ঘরে নামাজ আদায়কে বেশি উৎসাহিত করেন।

তারাবীহ ২০ রাকাতের দলিল ও উম্মাহর ঐক্য

রমজান মাস হলো ঐক্যের মাস। মসজিদে মসজিদে ২০ রাকাত তারাবীহ আদায় করা মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের প্রতীক। ১৪০০ বছর ধরে মক্কা-মদিনায় ২০ রাকাত তারাবীহ হয়ে আসছে। আমরা যদি আজ নতুন করে ৮ রাকাতের ধোঁয়া তুলে বিভেদ সৃষ্টি করি, তবে তা কি উম্মাহর জন্য কল্যাণকর হবে?

সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন, তাবে-তাবেয়িন এবং আইম্মায়ে মুজতাহিদীন—সবাই ২০ রাকাতের পক্ষে একমত ছিলেন। এই ঐকমত্য বা ইজমা আমাদের জন্য বড় শক্তি। তাই বিচ্ছিন্ন মতামতের চেয়ে জমহুর বা সংখ্যাগরিষ্ঠের মত মেনে চলাই নিরাপদ ও বুদ্ধিমানের কাজ।

দীর্ঘ কিরাত বনাম অধিক রাকাত প্রসঙ্গ

অনেকে বলেন, রাকাত কমিয়ে কিরাত দীর্ঘ করা ভালো। কিন্তু তারাবীতে রাকাত সংখ্যাও একটি ইবাদত। সাহাবীদের যুগে তাঁরা দীর্ঘ কিরাতও পড়তেন এবং ২০ রাকাতও আদায় করতেন। তাঁরা রাতের এক বড় অংশ নামাজের মধ্যে কাটিয়ে দিতেন।

আমাদের উচিত রাকাত সংখ্যা না কমিয়ে বরং মনোযোগ বাড়ানো। ২০ রাকাত নামাজে আমরা আল্লাহর দরবারে ২০ বার রুকু ও ৪০ বার সেজদা করার সুযোগ পাই। অধিক সেজদা আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম। তাই রাকাত কমিয়ে শর্টকাট না খুঁজে, ধীরস্থিরভাবে ২০ রাকাত আদায় করাই উত্তম।

বর্তমান সময়ে তারাবীহ ২০ রাকাত আদায়ের বাস্তবতা

বর্তমানে সৌদি আরবের মক্কা ও মদিনায় ২০ রাকাত তারাবীহ আদায় করা হয়। মাঝে করোনা পরিস্থিতির কারণে সাময়িকভাবে রাকাত সংখ্যা কমানো হয়েছিল, কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর আবারও সেই চিরাচরিত নিয়মে ফিরে যাওয়া হয়েছে। সারা বিশ্বের প্রায় সব প্রধান মসজিদেই ২০ রাকাতের আমল চালু আছে।

আমাদের দেশের মসজিদগুলোতেও খতম তারাবীহ ২০ রাকাতই হয়। এটি আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। তাই নতুন কোনো বিভ্রান্তিতে কান না দিয়ে, পূর্বসুরীদের দেখানো পথেই আমাদের চলা উচিত।

লেখকের শেষ কথা

পরিশেষে বলতে চাই, রমজান মাস সংযম ও তাকওয়ার মাস। এই মাসে আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। আমরা আলোচনার মাধ্যমে দেখলাম যে, তারাবীহ ২০ রাকাতের দলিল সাহাবায়ে কেরামের ইজমা এবং চার মাজহাবের ইমামগণের মতামতের ভিত্তিতে অত্যন্ত সুপ্রতিষ্ঠিত। সাহাবীরা যেটা ভালো মনে করেছেন এবং আমল করেছেন, সেটাই আমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ।

আরও পড়ুন: তারাবির নামাজের নিয়ত: আরবি ও বাংলা উচ্চারণসহ সঠিক নিয়ম ২০২৬

তাই আসুন, রাকাত সংখ্যা নিয়ে অহেতুক তর্ক-বিতর্কে না জড়িয়ে, একে অপরের সমালোচনা না করে, খুশুখুজুর সাথে ২০ রাকাত তারাবীহ আদায় করি। আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন, রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করার তৌফিক দিন এবং তারাবীহ ২০ রাকাতের দলিল অনুযায়ী আমল করে অশেষ সওয়াব লাভের সুযোগ করে দিন। আমিন।

Similar Posts

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *