হস্তমৈথুন করলে কি রোজা হবে? জানুন সঠিক বিধান ও করণীয়
রমজান মাস হলো আত্মশুদ্ধি এবং তাকওয়া অর্জনের মাস। সারাদিন না খেয়ে থাকার নামই শুধু রোজা নয়, বরং সব ধরণের পাপাচার থেকে নিজেকে দূরে রাখার নামই হলো আসল সিয়াম। কিন্তু অনেক সময় শয়তানের ধোঁকায় বা প্রবৃত্তির তাড়নায় যুবসমাজ ভুল করে বসে। অনেকেই লজ্জায় কাউকে সরাসরি জিজ্ঞেস করতে পারেন না—হস্তমৈথুন করলে কি রোজা হবে? আরে হ্যাঁ! এই প্রশ্নটি অনেকের মনেই জাগে এবং এটি নিয়ে ধোঁয়াশাও কম নয়।
ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক রোজা ভঙ্গের নির্দিষ্ট কিছু কারণ রয়েছে। আপনি যদি জানতে চান হস্তমৈথুন করলে কি রোজা হবে অথবা রোজা রেখে হস্তমৈথুন করলে কী বিধান প্রযোজ্য হবে, তবে এই আর্টিকেলটি আপনার জন্যই। ভেবে দেখুন তো, এত কষ্টের রোজা সামান্য ভুলের কারণে নষ্ট হয়ে গেলে কতটা খারাপ লাগবে! চলুন, আজ আমরা খোলামেলা আলোচনা করি হস্তমৈথুন কি রোজা ভাঙ্গে কি না এবং এর থেকে বাঁচার উপায় সম্পর্কে।
আরও পড়ুন: রোজা থাকা অবস্থায় পিরিয়ড হলে করণীয়: ইসলামের আলোকে পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন
হস্তমৈথুন কি রোজা ভাঙে — সরাসরি উত্তর
অনেকেই জানতে চান, হস্তমৈথুন করলে রোজা ভাঙবে কিনা? এর সরাসরি উত্তর হলো—হ্যাঁ, রোজা ভেঙে যাবে। ইসলামী ফিকহ বা শরীয়তের বিধান অনুযায়ী, রোজা রাখা অবস্থায় যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে হস্তমৈথুন করে এবং এর ফলে বীর্যপাত ঘটে, তবে তার রোজা বাতিল হয়ে যাবে।
রোজা হলো পানাহার ও যৌন সম্ভোগ থেকে বিরত থাকার নাম। হস্তমৈথুন বা মাস্টারবেশন যৌন সম্ভোগের বা কামবাসনা চরিতার্থ করার একটি অন্যায় পদ্ধতি। তাই দিনের বেলায় রোজা থাকা অবস্থায় এই কাজটি করলে রোজা নষ্ট হয়ে যায়। তবে মনে রাখবেন, যদি হস্তমৈথুন করার চেষ্টা করা হয় কিন্তু বীর্যপাত না ঘটে, তাহলে রোজা ভাঙবে না, কিন্তু রোজার সওয়াব বা পবিত্রতা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হবে।
ইসলামে হস্তমৈথুন কতটা নিষিদ্ধ?
ইসলামে স্বাভাবিক অবস্থাতেই হস্তমৈথুন করাকে অধিকাংশ আলেম হারাম বা মাকরুহে তাহরিমি (হারামের কাছাকাছি) বলেছেন। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের গুণাবলী বর্ণনা করতে গিয়ে সূরা আল-মুমিনুনে বলেছেন, যারা নিজেদের লজ্জাস্থানকে হেফাজত করে, তারা সফলকাম। সেখানে স্ত্রী ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে যৌন ক্ষুধা মেটানোকে সীমালঙ্ঘন বলা হয়েছে।
আর রমজান মাসে এই কাজটি করা আরও জঘন্য অপরাধ। একে তো এটি একটি অশ্লীল কাজ, তার ওপর এটি রমজানের পবিত্রতা নষ্ট করে। রোজা রেখে এমন কাজ করা মানে হলো আল্লাহর হুকুমের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করা। তাই এটি কেবল রোজা নষ্ট করে না, বরং ঈমানের দুর্বলতাও প্রকাশ করে।
রোজা ভাঙার কারণ কী কী — ফিকহের আলোকে
রোজার সময় কোন কাজ করলে রোজা ভাঙে আর কোনটায় ভাঙে না, তা নিয়ে ফিকহের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। আপনাদের বোঝার সুবিধার্থে একটি ছক দেওয়া হলো:
| কাজের বিবরণ | রোজার অবস্থা | মন্তব্য |
|---|---|---|
| ইচ্ছাকৃত পানাহার করা | রোজা ভেঙে যাবে | কাজা ও কাফফারা উভয়ই ওয়াজিব হতে পারে। |
| হস্তমৈথুনে বীর্যপাত হলে | রোজা ভেঙে যাবে | শুধুমাত্র কাজা আদায় করতে হবে। |
| স্বপ্নদোষ হলে | রোজা ভাঙবে না | এটি অনিচ্ছাকৃত শারীরিক প্রক্রিয়া। |
| স্ত্রীর সাথে সহবাস | রোজা ভেঙে যাবে | কাজা ও কাফফারা (৬০টি রোজা) ওয়াজিব হবে। |
| অনিচ্ছাকৃত বমি হওয়া | রোজা ভাঙবে না | মুখ ভরে ইচ্ছাকৃত বমি করলে ভাঙবে। |
রোজা রেখে হস্তমৈথুন করলে কাফফারা লাগবে কি?
এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা। রোজা রেখে স্ত্রী সহবাস করলে যেমন কাজা এবং কাফফারা (ধারাবাহিক ৬০টি রোজা রাখা) উভয়ই ফরজ হয়, হস্তমৈথুনের ক্ষেত্রে বিষয়টি একটু ভিন্ন। জমহুর ওলামায়ে কেরাম বা অধিকাংশ আলেমদের মতে, হস্তমৈথুন করে বীর্যপাত ঘটালে রোজা ভেঙে যায় এবং সেই রোজার কাজা (একটি রোজার পরিবর্তে একটি রোজা) আদায় করা ওয়াজিব হয়।
তবে আনন্দের সংবাদ হলো, সাধারণ ফতোয়া অনুযায়ী এর জন্য কাফফারা বা ৬০টি রোজা রাখতে হয় না। ইমাম মালিক (রহ.) এর একটি মত অনুযায়ী কাফফারাও ওয়াজিব হতে পারে, তবে হানাফি মাযহাব এবং অধিকাংশ ফিকহবিদদের মতে শুধুমাত্র কাজা আদায় করলেই চলবে। তবে মনে রাখবেন, কাফফারা নেই বলে এই পাপ কাজটিকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।
হস্তমৈথুন করলে রোজা ভাঙে — এ বিষয়ে আলেমদের একমত মত
চার মাযহাবের (হানাফি, শাফেয়ী, মালিকি, হাম্বলি) প্রায় সকল ইমাম একমত যে, রোজা রাখা অবস্থায় ইচ্ছাকৃতভাবে বীর্যপাত ঘটালে রোজা ফাসিদ বা নষ্ট হয়ে যায়। এটি নিয়ে আলেমদের মধ্যে বড় কোনো দ্বিমত নেই।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন, “বান্দা আমার জন্য তার পানাহার ও কামাচার বর্জন করে।” (সহীহ বুখারী)। সুতরাং, যখন কেউ হস্তমৈথুন করে, সে আসলে কামাচার বর্জন করল না, ফলে তার রোজা বাতিল হয়ে গেল। তাই হস্তমৈথুন করলে রোজা হবে কি না, এ নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই—নিশ্চিতভাবেই রোজা ভেঙে যাবে।
রোজা ভেঙে গেলে পরবর্তী করণীয় কী?
এখন প্রশ্ন হলো, যদি শয়তানের ধোঁকায় পড়ে কেউ এই ভুলটি করেই ফেলে, তবে তার তাৎক্ষণিক করণীয় কী? রোজা তো ভেঙে গেছে, এখন কি সারাদিন খাওয়া-দাওয়া করা যাবে?
- ইমসাক করা: রোজা ভেঙে গেলেও দিনের বাকি সময় রোজাদারের মতো পানাহার থেকে বিরত থাকতে হবে। একে ফিকহের পরিভাষায় ‘ইমসাক’ বলা হয়। এটি রোজার সম্মানার্থে করা জরুরি।
- কাজা আদায়: রমজান শেষ হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব ওই নষ্ট হওয়া রোজাটির কাজা আদায় করে নিতে হবে।
- তওবা করা: এটি একটি কবিরা গুনাহ। তাই আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে ক্ষমা চাইতে হবে।
রমজানে এই পাপ থেকে বাঁচার উপায়
রমজানে শয়তান শিকলবন্দী থাকে, তবুও মানুষের নফস বা প্রবৃত্তি তাকে পাপের দিকে টানে। এই জঘন্য অভ্যাস থেকে বাঁচার জন্য নিচের টিপসগুলো কাজে লাগাতে পারেন:
- দৃষ্টি সংযত রাখা: সোশ্যাল মিডিয়া বা রাস্তায় অশ্লীল দৃশ্য থেকে চোখ ফিরিয়ে রাখুন। চোখের গুনাহই অন্তরে বাজে চিন্তার জন্ম দেয়।
- একাকী না থাকা: যতটা সম্ভব পরিবারের সদস্যদের সাথে সময় কাটান। একা ঘরে দরজা বন্ধ করে থাকলে শয়তান কুমন্ত্রণা দেওয়ার সুযোগ পায়।
- ইবাদতে মশগুল থাকা: অবসর সময়ে কোরআন তিলাওয়াত বা জিকির করুন।
- ঠান্ডা পানি দিয়ে ওজু করা: যখনই বাজে চিন্তা আসবে, তখনই ওজু করে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে নেবেন।
তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনার পদ্ধতি
মানুষ মাত্রই ভুল করে। কিন্তু শ্রেষ্ঠ ভুলকারী সে, যে ভুলের পর তওবা করে। আপনি যদি এই পাপে অভ্যস্ত হয়ে থাকেন, তবে রমজানই হলো ফিরে আসার সেরা সময়। আল্লাহ তাআলা ক্ষমাশীল। দুই চোখের পানি ফেলে আল্লাহর কাছে বলুন, “হে আল্লাহ, আমি নফসের ধোঁকায় পড়ে অন্যায় করেছি, তুমি আমাকে মাফ করে দাও এবং আর কখনো এই কাজ করব না।”
খাঁটি মনে তওবা করলে আল্লাহ অবশ্যই মাফ করবেন। তবে প্রতিজ্ঞা করতে হবে যে, আর কখনো এই বদভ্যাস বা পাপ কাজের ধারেকাছেও যাবেন না।
প্রায়ই জিজ্ঞেস করা প্রশ্ন (FAQ)
১. স্বপ্নদোষ হলে কি রোজা ভেঙে যায়?
উত্তর: না, স্বপ্নদোষ একটি অনিচ্ছাকৃত প্রক্রিয়া। এতে রোজা ভাঙে না এবং কাজাও আদায় করতে হয় না।
২. শুধু কামোত্তেজক চিন্তা করলে কি রোজা ভাঙবে?
উত্তর: না, যতক্ষণ পর্যন্ত বীর্যপাত না হচ্ছে, ততক্ষণ চিন্তা বা দেখার কারণে রোজা ভাঙবে না। তবে এতে রোজার সওয়াব কমে যায়।
৩. রোজা রেখে পর্নোগ্রাফি দেখলে কি রোজা হবে?
উত্তর: এটি মারাত্মক গুনাহের কাজ। এতে বীর্যপাত না হলে রোজা ভাঙবে না বটে, কিন্তু এমন রোজার আধ্যাত্মিক কোনো মূল্য আল্লাহর কাছে থাকে না।
শেষ কথা
পরিশেষে, আমাদের মনে রাখতে হবে যে রমজান মাস সংযমের মাস। হস্তমৈথুন করলে কি রোজা হবে—এর উত্তর আমরা জানলাম যে, এতে রোজা ভেঙে যায় এবং কাজা আদায় করা ওয়াজিব হয়। তাই রোজা রেখে হস্তমৈথুন করা বা হস্তমৈথুন করলে রোজা ভাঙ্গে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা কোনো মুমিনের কাজ হতে পারে না।
আরও পড়ুন: রোজা থাকা অবস্থায় স্বপ্নদোষ হলে করণীয়। রোজা কি ভাঙে?
আসুন, আমরা এই পবিত্র মাসে সব ধরণের অশ্লীলতা থেকে নিজেকে হেফাজত করি। যদি মনের ভুলে হস্তমৈথুন করলে রোজা হবে কি না তা নিয়ে দ্বিধা থাকে, তবে আজকের এই লেখাটি থেকে শিক্ষা নিয়ে সতর্ক হই। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই বদভ্যাস ত্যাগ করে বিশুদ্ধ রোজা রাখার তৌফিক দান করুন। আমিন।







2 Comments