সেহরি করার নিয়ত,সেহরি করার দোয়া

সেহরি করার নিয়ত ও সেহরি করার দোয়া: জানুন সঠিক নিয়ম ও আমল

আরে হ্যাঁ! বছর ঘুরে আবারও আমাদের মাঝে রহমত, মাগফিরাত আর নাজাতের বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছে পবিত্র মাহে রমজান। ভেবে দেখুন তো, সারাদিন না খেয়ে থাকার পর ইফতারের আনন্দ যেমন অতুলনীয়, ঠিক তেমনি শেষ রাতে উঠে সেহরি খাওয়ার মধ্যেও রয়েছে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। তবে, অনেক সময় আমরা তাড়াহুড়ো করে খেতে গিয়ে **সেহরি করার নিয়ত** সঠিকভাবে করতে ভুলে যাই, অথবা **সেহরি করার দোয়া** ঠিকমতো পড়া হয় না। অথচ রোজার পূর্ণতা পাওয়ার জন্য নিয়ত বা অন্তরের সংকল্প থাকাটা কিন্তু ভীষণ জরুরি।

অনেকেই মনে করেন, মুখে আরবি দোয়া পাঠ করাটাই বোধহয় একমাত্র নিয়ম। আসলে কি তাই? নাকি মনের ইচ্ছাই যথেষ্ট? এই আর্টিকেলে আমরা খুব সহজ বাংলায় জানব **সেহরি করার নিয়ত** এবং **সেহরি করার দোয়া** সম্পর্কে বিস্তারিত। পাশাপাশি **সেহরি করার নিয়ম** নিয়েও থাকবে প্রয়োজনীয় আলোচনা, যাতে আপনার রোজা হয় ত্রুটিমুক্ত ও আল্লাহপাকের দরবারে কবুল হওয়ার যোগ্য। চলুন, আর দেরি না করে মূল আলোচনায় প্রবেশ করা যাক।

আরও পড়ুন: তারাবীহ ২০ রাকাতের দলিল ও সঠিক তথ্য | রমজান স্পেশাল

সেহরি করার নিয়ত কী ও কেন গুরুত্বপূর্ণ

সহজ কথায় ‘নিয়ত’ মানে হলো সংকল্প বা ইচ্ছে করা। আপনি যে আগামীকাল রোজা রাখবেন, এই সিদ্ধান্তটি মনে মনে নেওয়াই হলো সেহরি করার নিয়ত। হাদিসে বলা হয়েছে, “সমস্ত কাজের ফলাফল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।” তাই রোজা রাখার জন্য নিয়ত করা ফরজ। আপনি যদি সেহরি খান কিন্তু মনে মনে রোজা রাখার কোনো ইচ্ছে না থাকে, তবে সেটা উপবাস হবে, ইবাদত হবে না।

অনেকে ভাবেন, নিয়ত মানেই বড় কোনো আরবি বাক্য আওড়ানো। আসলে বিষয়টি তেমন জটিল নয়। আপনি যে আল্লাহকে খুশি করার জন্য সুবহে সাদিকের আগে খাবার খাচ্ছেন এবং সারাদিন পানাহার থেকে বিরত থাকবেন—এই মানসিক প্রস্তুতিটাই হলো আসল নিয়ত। এই নিয়ত না থাকলে সারাদিন না খেয়ে থাকলেও রোজা আদায় হবে না। তাই এর গুরুত্ব অপরিসীম।

রোজার নিয়ত ও সেহরি করার নিয়তের পার্থক্য

এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে যা আমাদের বোঝা দরকার। সেহরি খাওয়া সুন্নত, আর রোজার নিয়ত করা ফরজ। সেহরি খাওয়ার সময় আমরা যে নিয়ত বা সংকল্প করি, সেটা মূলত রোজারই প্রস্তুতি। অর্থাৎ, আলাদাভাবে ‘সেহরি খাওয়ার জন্য’ বিশেষ কোনো নিয়ত নেই, বরং রোজা রাখার উদ্দেশ্যেই আমরা সেহরি খাই।

তবে সেহরি খাওয়াটা নিজেই একটা ইবাদত। মহানবী (সা.) বলেছেন, “তোমরা সেহরি খাও, কারণ সেহরিতে বরকত রয়েছে।” তাই সেহরি খাওয়ার সময় মনে মনে এই ধারণা রাখা উচিত যে, আমি সুন্নত পালন করছি এবং রোজা রাখার শক্তি সঞ্চয় করছি। এই চিন্তাধারাটিই আপনার সাধারণ খাবার খাওয়াকে ইবাদতে পরিণত করবে।

সেহরি করার নিয়ত কিভাবে করতে হয়

নিয়ত করার বিষয়টি সম্পূর্ণ অন্তরের ব্যাপার। আপনি যখন রাতে ঘুমানোর আগে বা শেষ রাতে সেহরি খাওয়ার জন্য উঠলেন, তখন আপনার মনে যদি এই সংকল্প থাকে যে—‘আমি আজ রোজা রাখব’, তাহলেই আপনার নিয়ত হয়ে গেল। এর জন্য মুখে উচ্চারণ করে কিছু বলা বাধ্যতামূলক নয়।

তবুও, মনকে স্থির করার জন্য এবং মনোযোগ বাড়ানোর জন্য ওলামায়ে কেরাম মুখে নিয়ত করাকে মুস্তাহাব বা ভালো বলেছেন। তবে মনে রাখবেন, মুখে বললেন কিন্তু অন্তরে খবর নেই—এমন হলে নিয়ত শুদ্ধ হবে না। আসল হলো দিলের ইরাদা বা মনের ইচ্ছা।

আরবিতে সেহরি করার নিয়ত (সেহরি করার দোয়া)

আমাদের দেশে রোজার নিয়ত বা সেহরি করার দোয়া হিসেবে একটি আরবি বাক্য খুব প্রচলিত। যদিও এটি হাদিস দ্বারা সরাসরি প্রমাণিত কোনো নির্দিষ্ট দোয়া নয়, তবুও অর্থের সুন্দরতার কারণে অনেকে এটি পড়ে থাকেন। নিচে একটি ছকের মাধ্যমে এই দোয়াটি তুলে ধরা হলো:

বিষয়বিস্তারিত
আরবি দোয়াنَوَيْتُ اَنْ اُصُوْمَ غَدًا مِّنْ شَهْرِ رَمَضَانَ الْمُبَارَكِ فَرْضًا لَكَ يَا اللهُ فَتَقَبَّل مني إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيم
বাংলা উচ্চারণনাওয়াইতু আন আছুমা গাদাম মিন শাহরি রমাজানাল মুবারাকি ফারদাল্লাকা ইয়া আল্লাহু ফাতাকাব্বাল মিন্নি ইন্নাকা আনতাস সামিউল আলিম।
বাংলা অর্থহে আল্লাহ! আমি আগামীকাল পবিত্র রমজানের তোমার ফরজ রোজা রাখার নিয়ত করলাম। অতএব তুমি আমার পক্ষ থেকে তা কবুল কর, নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।

বাংলায় সেহরি করার নিয়ত বলার নিয়ম

যাদের আরবি উচ্চারণ করতে কষ্ট হয় বা মুখস্থ নেই, তাদের চিন্তার কোনো কারণ নেই। আল্লাহ সব ভাষা বোঝেন। আপনি নিজের মাতৃভাষা বাংলাতেও নিয়ত করতে পারেন। এতে কোনো দোষ নেই, বরং অর্থ বুঝে নিয়ত করাটা আরও বেশি ফলপ্রসূ।

আপনি মনে মনে বা নিচু স্বরে এভাবে বলতে পারেন: “হে আল্লাহ, আমি তোমার সন্তুষ্টির জন্য আগামীকাল রমজানের ফরজ রোজা রাখার নিয়ত করছি। তুমি আমার এই রোজা কবুল করো।” ব্যাস, এতটুকু বললেই আপনার দায়িত্ব আদায় হয়ে যাবে। ভাষার চেয়ে মনের আকুতিটাই এখানে মুখ্য।

নিয়ত কি মুখে বলা জরুরি?

এটি একটি খুব সাধারণ প্রশ্ন। ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী, নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা জরুরি নয়, তবে উত্তম হতে পারে। আগেই বলেছি, নিয়তের স্থান হলো অন্তর। আপনি যদি সেহরির সময় ঘুম থেকে ওঠেন এবং খাবার খান, সেটাই প্রমাণ করে যে আপনি রোজা রাখতে চান। এটাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ত হিসেবে গণ্য হয়।

তবে শাব্দিক উচ্চারণে নিজের সংকল্পকে আরও দৃঢ় করা যায়। বিশেষ করে যাদের মনে সন্দেহ কাজ করে বা ‘ওয়াসওয়াসা’ আছে, তারা মুখে উচ্চারণ করে নিয়ত করলে মানসিক প্রশান্তি পান। কিন্তু কেউ যদি মুখে কিছুই না বলে, শুধু মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়, তবুও তার **সেহরি করার নিয়ম** অনুযায়ী রোজা হয়ে যাবে।

সেহরির সময় ও নিয়তের সঠিক মুহূর্ত

সেহরির সময় শুরু হয় রাতের শেষ ভাগে এবং শেষ হয় সুবহে সাদিকের আগ মুহূর্তে। **সেহরি করার নিয়ম** হলো, শেষ সময়ের একটু আগে উঠে ধীরস্থিরে খাবার খাওয়া। খুব তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়া সুন্নতের খেলাফ।

আর নিয়তের সঠিক সময় হলো সূর্যাস্তের পর থেকে শুরু করে পরদিন দুপুরের আগ পর্যন্ত (হানাফি মাযহাব মতে)। তবে উত্তম হলো সেহরির সময় বা ফজরের আগেই নিয়ত করে ফেলা। যদি কেউ সেহরি খেতে না পারে বা ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়, তবুও ঘুম থেকে ওঠার পর দুপুরের আগে নিয়ত করে নিলেই রোজা আদায় হয়ে যাবে, যদি সুবহে সাদিকের পর কিছু না খেয়ে থাকে।

সেহরি না খেলে রোজা হবে কি না

অনেক সময় গভীর ঘুমে তলিয়ে থাকায় সেহরি খাওয়া সম্ভব হয় না। ঘুম ভাঙলে দেখা যায় ফজর হয়ে গেছে। তখন অনেকেই দুশ্চিন্তায় পড়েন যে রোজা হবে কি না। উত্তর হলো—হ্যাঁ, রোজা হবে। সেহরি খাওয়া সুন্নত, ফরজ নয়। তাই সেহরি মিস হলেও আপনি যদি না খেয়ে রোজা চালিয়ে যান এবং মনে মনে নিয়ত করে নেন, তবে রোজা হয়ে যাবে। তবে ইচ্ছে করে সেহরি বাদ দেওয়া উচিত নয়, কারণ এতে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সুন্নতের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হতে হয়।

নারীদের জন্য সেহরি করার নিয়ত

পুরুষদের মতো নারীদের জন্যও নিয়তের নিয়ম একই। তবে নারীদের ক্ষেত্রে পিরিয়ড বা মাসিক চলাকালীন রোজা রাখা নিষিদ্ধ। পবিত্র হওয়ার পর যখন তারা আবার রোজা শুরু করবেন, তখন প্রতিদিনের জন্য আলাদা আলাদা নিয়ত করতে হবে। রান্নাবান্না ও পরিবারের সবাইকে খাওয়ানোর ব্যস্ততার মাঝেও মা-বোনদের খেয়াল রাখতে হবে যেন নিজেদের নিয়ত ও দোয়া পাঠ বাদ না পড়ে। কাজের ফাঁকে মনে মনে একবার সংকল্প করে নেওয়াই যথেষ্ট।

রমজানের অন্যান্য ইবাদত ও নিয়তের গুরুত্ব

রমজান মাস শুধু না খেয়ে থাকার মাস নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধির সময়। রোজার পাশাপাশি তারাবিহ, তাহাজ্জুদ, কুরআন তিলাওয়াত এবং দান-সদকার গুরুত্ব অনেক। প্রতিটি আমলের শুরুতেই নিয়ত শুদ্ধ করা প্রয়োজন। আপনি লোক দেখানো ইবাদত করছেন নাকি আল্লাহকে খুশি করার জন্য—তার ওপর ভিত্তি করেই সওয়াব মিলবে। তাই সেহরির সময় শুধু খাবারের চিন্তায় মগ্ন না থেকে, একটু সময় নিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করা এবং দিনের বাকি আমলগুলোর জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়া উচিত।

সেহরি করার নিয়ত নিয়ে সাধারণ ভুল

সেহরি ও নিয়ত নিয়ে আমাদের সমাজে কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। চলুন দেখে নিই সেগুলো কী কী:

  • মুখে বলা ফরজ মনে করা: অনেকে ভাবেন আরবিতে নিয়ত না পড়লে রোজা হবে না, এটি ভুল ধারণা।
  • আজান শুরু হওয়া পর্যন্ত খাওয়া: অনেকে মনে করেন ফজরের আজান শেষ হওয়া পর্যন্ত খাওয়া যায়। এটি মারাত্মক ভুল। সুবহে সাদিকের সাথে সাথেই খাওয়া বন্ধ করতে হবে।
  • একসাথে পুরো মাসের নিয়ত: কেউ কেউ মাসের শুরুতে একবার নিয়ত করে ভাবেন আর লাগবে না। আসলে রমজানে প্রতিদিনের জন্য আলাদা নিয়ত করা উত্তম।
  • দেরি করে সেহরি না খাওয়া: অনেক আগেভাগে খেয়ে শুয়ে পড়া **সেহরি করার নিয়ম** এর পরিপন্থী।

সেহরি করার নিয়ত ও তাকওয়ার সম্পর্ক

রোজার মূল উদ্দেশ্যই হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন করা। আর এই তাকওয়ার শুরুটাই হয় নিয়তের মাধ্যমে। আপনি যখন গভীর রাতে আরামের ঘুম হারাম করে আল্লাহর হুকুম মানার জন্য উঠলেন, তখনই তাকওয়ার চর্চা শুরু হলো। এই যে লোকচক্ষুর আড়ালে আপনি খাবার খাচ্ছেন এবং পরে ক্ষুধার্থ থেকেও কিছু খাচ্ছেন না—সবই আল্লাহর ভয়ে। নিয়ত শুদ্ধ হলে এই ভয় ও ভালোবাসা আরও প্রগাঢ় হয়, যা মুমিনের চরিত্র গঠনে সহায়তা করে।

লেখকের শেষ কথা

রমজান আমাদের জন্য এক বড় সুযোগ। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজেকে শুধরে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। আশা করি, আজকের আলোচনার মাধ্যমে **সেহরি করার নিয়ত** এবং **সেহরি করার দোয়া** নিয়ে আপনাদের মনের সব সংশয় দূর হয়েছে। নিয়ম মেনে সেহরি খান, সুস্থ থাকুন এবং বেশি বেশি ইবাদত করুন।

আরও পড়ুন: তারাবির নামাজ পড়ার নিয়ম ও ফজিলত ২০২৬

পরিশেষে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে সঠিক নিয়মে **সেহরি করার নিয়ত** ও আমল করার তৌফিক দান করুন। আমাদের প্রতিটি **সেহরি করার দোয়া** ও রোজা কবুল করে নিন। আমিন। লেখাটি ভালো লাগলে পরিচিতদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না!

Similar Posts

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *