তারাবির নামাজের দোয়া

তারাবির নামাজের দোয়া ও নিয়ত। শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণসহ বিস্তারিত নিয়ম

আসছে পবিত্র মাহে রমজান! আরে হ্যাঁ, সারা বছরের অপেক্ষার পর এই মাসটি আমাদের মাঝে রহমতের বার্তা নিয়ে আসে। আর রমজানের অন্যতম প্রধান ইবাদত হলো তারাবির নামাজ। সারাদিন রোজা রাখার পর রাতের বেলা আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ার প্রশান্তিই আলাদা। কিন্তু অনেকেই চিন্তায় পড়ে যান—তারাবির নামাজের দোয়া ঠিকমতো মুখস্ত আছে তো? কিংবা তারাবির নামাজের নিয়ত ঠিকঠাক হচ্ছে তো? ভেবে দেখুন তো, ইবাদতের প্রস্তুতি যদি পাকাপোক্ত হয়, তাহলে মনে কতই না শান্তি লাগে!

আসলে তারাবির নামাজ নিয়ে আমাদের মনে নানা প্রশ্ন থাকে। বিশেষ করে চার রাকাত পর পর যে দোয়াটি পড়া হয়, সেটা অনেকেই গুলিয়ে ফেলেন। চিন্তার কোনো কারণ নেই! আজকের এই আর্টিকেলে আমরা খুব সহজ ভাষায়, চলিত বাংলায় সব নিয়মকানুন আলোচনা করব। এখানে আপনারা পাবেন শুদ্ধ উচ্চারণে তারাবির নামাজের দোয়া, মোনাজাত এবং তারাবির নামাজের নিয়ত কিভাবে করতে হয় তার বিস্তারিত গাইডলাইন। চলুন তাহলে, দেরি না করে ইবাদতের প্রস্তুতি শুরু করা যাক।

আরও পড়ুন: সাদা সোনা কাকে বলে এবং কীভাবে তৈরি হয়

তারাবির নামাজের গুরুত্ব ও ফজিলত

রমজান মাসে তারাবির নামাজ পড়া সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। এটি নারী-পুরুষ সবার জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় রমজানের রাতে তারাবির নামাজ আদায় করবে, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।” বুঝতেই পারছেন, এই নামাজের গুরুত্ব কতটা অপরিসীম। সারাদিনের ক্লান্তি ভুলে যখন মুসল্লিরা কাতারে দাঁড়ান, তখন এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি হয়।

তারাবির নামাজ পড়ার নিয়ম

এশার নামাজের চার রাকাত ফরজ ও দুই রাকাত সুন্নতের পর এবং বিতর নামাজের আগে এই নামাজ পড়া হয়। সাধারণত ২০ রাকাত তারাবির নামাজ পড়া হয়। প্রতি দুই রাকাত পর পর সালাম ফেরাতে হয় এবং প্রতি চার রাকাত পর একটু বিশ্রাম নিতে হয়। এই বিশ্রামের সময়ই মুসল্লিরা তাসবিহ পাঠ করেন বা দোয়া পড়েন।

তারাবির নামাজের দোয়া (চার রাকাত পর পর)

অনেকেই মনে করেন, চার রাকাত পর পর নির্দিষ্ট কোনো দোয়া পড়তেই হবে, না হলে নামাজ হবে না। বিষয়টি কিন্তু এমন নয়। আপনি চাইলে যেকোনো তাসবিহ, দরুদ শরীফ বা জিকির করতে পারেন। তবে যুগ যুগ ধরে আলেম ও বুজুর্গরা একটি নির্দিষ্ট দোয়া পড়ে আসছেন, যা আমাদের দেশে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। নিচে দোয়াটি আরবি, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থসহ দেওয়া হলো:

আরবিবাংলা উচ্চারণঅর্থ
سُبْحانَ ذِي الْمُلْكِ وَالْمَلَكُوتِ سُبْحانَ ذِي الْعِزَّةِ وَالْعَظَمَةِ وَالْهَيْبَةِ وَالْقُدْرَةِ وَالْكِبْرِياءِ وَالْجَبَرُوْتِ سُبْحانَ الْمَلِكِ الْحَيِّ الَّذِي لا يَنَامُ وَلا يَمُوتُ سُبُّوحٌ قُدُّوْسٌ رَبُّنا وَرَبُّ الْمَلائِكَةِ وَالرُّوْحِসুবহানাজিল মুলকি ওয়াল মালাকুতি, সুবহানাজিল ইজ্জাতি, ওয়াল আজমাতি, ওয়াল হায়বাতি, ওয়াল কুদরাতি, ওয়াল কিবরিয়াই, ওয়াল জাবারুত। সুবহানাল মালিকিল হাইয়্যিল লাজি লা-ইয়ানামু ওয়ালা ইয়ামুতু আবাদান আবাদা; সুব্বুহুন কুদ্দুসুন রব্বুনা ওয়া রব্বুল মালাইকাতি ওয়ার রূহ।পাক-পবিত্র সেই সত্তা যিনি জগত ও মহাজগতের মালিক। পাক-পবিত্র সেই সত্তা যিনি সম্মান, মহত্ত্ব, ভীতি, ক্ষমতা, ও প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারী। পাক-পবিত্র সেই সত্তা যিনি চিরঞ্জীব, যার ঘুম নেই এবং মৃত্যু নেই। তিনি পবিত্র, মহাপবিত্র, আমাদের প্রতিপালক এবং ফেরেশতাকুল ও জিবরাঈল (আ.)-এর প্রতিপালক।

তারাবির নামাজের নিয়ত কিভাবে করতে হয়

নিয়ত মানে হলো মনের ইচ্ছা। মুখে উচ্চারণ করা জরুরি নয়, তবে মনের মধ্যে সংকল্প থাকতে হবে। তারাবির নামাজের নিয়ত কিভাবে করতে হয় তা নিয়ে অনেকের মনেই দ্বিধা থাকে। খুব সহজভাবে চিন্তা করুন। আপনি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কেবলামুখী হয়ে দুই রাকাত তারাবির নামাজ আদায় করছেন—এই ইচ্ছা মনে থাকলেই হবে।

তবুও যারা মুখে আরবি বা বাংলায় নিয়ত করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, তাদের জন্য নিচে দেওয়া হলো:

  • বাংলা নিয়ত: “আমি কেবলামুখী হয়ে আল্লাহর ওয়াস্তে দুই রাকাত তারাবির সুন্নাত নামাজ আদায়ের নিয়ত করছি। আল্লাহু আকবার।”
  • আরবি নিয়ত: নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাহি তাআলা, রাকআতাই সালাতিৎ তারাবিহ, সুন্নাতু রাসুলিল্লাহি তাআলা, মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শারিফাতি, আল্লাহু আকবার।

তারাবির নামাজের মোনাজাত

২০ রাকাত তারাবির নামাজ শেষ করার পর সম্মিলিতভাবে বা একাকী মোনাজাত করার প্রচলন রয়েছে। এই মোনাজাতের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর কাছে জান্নাত প্রার্থনা করি এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি চাই। বহুল প্রচলিত মোনাজাতটি হলো:

“আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকা জান্নাতা ওয়া নাউজুবিকা মিনান নারি, ইয়া খালিকু ইয়া জান্নাতু ইয়া রহিম…”

যদি এই বড় দোয়াটি মুখস্ত না থাকে, তবে চিন্তার কিছু নেই। নিজের ভাষায় আল্লাহর কাছে প্রাণ খুলে যা চাইবেন, আল্লাহ তাই কবুল করবেন। মনে রাখবেন, দোয়ার ভাষা নয়, দোয়ার আবেগ আর আকুতিটাই আসল।

মহিলাদের তারাবির নামাজের নিয়ম

মা-বোনদের জন্য ঘরে তারাবির নামাজ পড়া উত্তম। পুরুষদের মতোই মহিলারাও এশার নামাজের পর ২০ রাকাত তারাবির নামাজ আদায় করবেন। তবে তাদের জামাতে নামাজ পড়ার প্রয়োজন নেই, তারা একা একাই পড়বেন। মহিলাদের ক্ষেত্রেও তারাবির নামাজের নিয়ত এবং দোয়া একই থাকবে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে নামাজ আদায় করে নেওয়াটা তাদের জন্য সুবিধাজনক।

কিছু সাধারণ ভুল ও সতর্কতা

তারাবির নামাজ পড়তে গিয়ে আমরা অনেক সময় তাড়াহুড়ো করে ফেলি। বিশেষ করে হাফেজি খতম তারাবিতে রুকু-সিজদা ঠিকমতো আদায় হচ্ছে কি না, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। মনে রাখবেন, নামাজ কোনো ব্যায়াম নয়, এটি আল্লাহর সাথে বান্দার কথোপকথন। তাই ধীরস্থিরভাবে তেলাওয়াত শোনা এবং রুকু-সিজদা করা উচিত।

  • ইমামের তেলাওয়াত মনোযোগ দিয়ে শোনা।
  • অহেতুক নড়াচড়া না করা।
  • প্রতি চার রাকাত পর পানি পান বা বিশ্রাম নেওয়া যেতে পারে, তবে মসজিদে হইচই করা যাবে না।
  • দোয়া মুখস্ত না থাকলে চুপ করে থাকাও ভালো, ভুল পড়ার চেয়ে।

পরিশেষে বলা যায়, রমজান মাস হলো নিজেকে শুধরে নেওয়ার এবং আল্লাহর খুব কাছাকাছি যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ। আশা করি, আজকের এই আলোচনার মাধ্যমে আপনারা তারাবির নামাজের দোয়া, নিয়মকানুন এবং মোনাজাত সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেয়েছেন। ছোটখাটো বিষয় নিয়ে দ্বিধা না করে, শুদ্ধভাবে ইবাদত করার চেষ্টা করুন।

আরও পড়ুন: ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে পুরুষের জন্য স্বর্ণ ব্যবহার

আল্লাহ আমাদের সবাইকে সহীহভাবে তারাবির নামাজের নিয়ত করে, ভক্তি ও শ্রদ্ধার সাথে নামাজ আদায় করার তৌফিক দান করুন। এই রমজান যেন আমাদের সবার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং পাপমুক্ত জীবন গড়ার পথ দেখায়। আমিন।

Similar Posts